২০২৭ সালের জন্য অপরিশোধিত তেলের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কমানোর পেছনে বিশ্বজুড়ে রেকর্ড উৎপাদন বৃদ্ধি এবং প্রধান বাজারগুলোয় চাহিদা কমে যাওয়াকে প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। সম্প্রতি রয়টার্সে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদনে গোল্ডম্যান স্যাকস জানায়, ২০২৭ সালে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের গড় দাম দাঁড়াতে পারে ৮০ ডলারে, যা তাদের আগের পূর্বাভাসের চেয়ে কম। মূলত ওপেক জোট-বহির্ভূত যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, গায়ানা, ভেনিজুয়েলা ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মতো দেশগুলোয় তেল উত্তোলন আশাতীতভাবে বাড়ছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের সার্বিক চাহিদা কমে যাওয়ায় দামের ওপর এর বড় প্রভাব পড়ছে। তবে ব্যাংকের জ্বালানি বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, বর্তমান ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে জ্বালানি তেলের দাম যেকোনো সময় তীব্রভাবে ওঠানামা করতে পারে।
গবেষণা অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের প্রথাগত দেশগুলোর বাইরেও বিশ্বের অন্য অঞ্চলে তেল উৎপাদন দ্রুতগতিতে বাড়ছে। ফলে বাজারে সরবরাহ পর্যাপ্ত থাকলেও সে তুলনায় তেলের বৈশ্বিক ব্যবহার বা চাহিদা বাড়ছে না।
বিশ্ববাজারে তেলের চাহিদা কমে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে চীন। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক দেশটিতে বর্তমানে জ্বালানি ব্যবহারের ধরনে একটি বড় কাঠামোগত পরিবর্তন আসছে। গোল্ডম্যান স্যাকস জানিয়েছে, চীনের বাজারে বিকল্প জ্বালানি, বিশেষ করে বৈদ্যুতিক যানবাহনের (ইভি) প্রসার বেশ দ্রুতগতিতে বাড়ছে। এ পরিবর্তনের কারণে জ্বালানি তেলের বাজারে যে মন্দা তৈরি হয়েছে, তার অন্তত ১০ শতাংশ দীর্ঘস্থায়ী হবে। এর অর্থ চীনের অর্থনীতি পুরোপুরি সচল হলেও ভবিষ্যতে দেশটির অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের ওপর নির্ভরতা আগের মতো আর বাড়বে না।
দীর্ঘমেয়াদি দামের পূর্বাভাস কমালেও চলতি বছরের শেষ প্রান্তিকের (অক্টোবর-ডিসেম্বর) জন্য আগের পূর্বাভাসই বজায় রেখেছে সংস্থাটি।
এ সময়ে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের গড় দাম প্রতি ব্যারেল ৯০ ডলার থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালিতে চলমান সংঘাতের কারণে সাময়িকভাবে তেলের দাম চড়া রয়েছে। তবে শুরুর দিকে যতটা ঘাটতির আশঙ্কা করা হয়েছিল, বাস্তব পরিস্থিতি ততটা ভয়াবহ হয়নি। বাজারে আগের উদ্বৃত্ত তেল থাকায় এবং বৈশ্বিক চাহিদা কম থাকায় এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে দৈনিক ৫০-৬০ লাখ ব্যারেলের এ ধাক্কা সামলানো সম্ভব হয়েছে। আগস্টের শেষের দিকে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল রফতানি পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে মনে করছে গোল্ডম্যান স্যাকস। সেই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেল সরবরাহ আগের স্বাভাবিক অবস্থার ৭০ শতাংশে পৌঁছবে।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্য সম্ভাব্য দুটি বিপরীত পরিস্থিতিও তুলে ধরেছে প্রতিষ্ঠানটি। যদি মধ্যপ্রাচ্যে ভূরাজনৈতিক সংকট আরো দীর্ঘায়িত হয়, তবে ২০২৬ সালের শেষের দিকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১১০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। সংকট যদি আগামী বছরজুড়ে চলে, তবে ২০২৭ সালে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৪০ ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে।
অন্যদিকে যদি সংঘাত দ্রুত প্রশমিত হয় এবং জ্বালানি তেলের বৈশ্বিক চাহিদা কম থাকে, তবে ২০২৬ সালের শেষ দিকে তেলের দাম ৭০ ডলারে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে তা কমে ব্যারেলপ্রতি ৬০ ডলারে নেমে আসতে পারে।
বাংলাদেশর মতো তেল আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য এ পূর্বাভাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমলে দেশের আমদানি ব্যয় কমবে, তবে যেকোনো ধরনের ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দেশের সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।